হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

ও তাঁর অমর সৃষ্টি 'ইহয়া উলুমুদ্দীন'

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (১০৫৮-১১১১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও সুফি সাধক। তাঁকে 'হুজ্জাতুল ইসলাম' বা 'ইসলামের প্রমাণ' বলা হয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ফিকহ (আইনশাস্ত্র) এবং তাসাউফ (আধ্যাত্মিকতা)-এর মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করা, যার পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো তাঁর গ্রন্থ 'ইহয়া উলুমুদ্দীন' (ধর্মীয় জ্ঞানের পুনর্জাগরণ)।

জীবন পরিক্রমা ও ঘটনার আড়ালে

জন্ম ও বাল্যকাল (১০৫৮ খ্রি.)

স্থান: তুস নগরী, খোরাসান (বর্তমান ইরান)

শৈশবেই পিতাকে হারান। পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী এক সুফি বন্ধুর কাছে লালিত-পালিত হন। অর্থাভাবে মাদরাসায় ভর্তি হন, যা ছিল তাঁর জ্ঞানুসাধনার প্রথম ধাপ।

নিশাপুরে শিক্ষা ও ইমামুল হারামাইন

শিক্ষক: ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী

তৎকালীন শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ নিশাপুরে তিনি ইমাম আল-জুওয়াইনীর অধীনে শিক্ষা লাভ করেন। এখানে তিনি ফিকহ, উসুল এবং কালাম শাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসায় প্রধান অধ্যাপক

বয়স: মাত্র ৩৩ বছর

সেলজুক উজির নিজামুল মুলক তাঁকে বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসার প্রধান অধ্যাপক নিয়োগ দেন। এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ একাডেমিক পদ। তাঁর খ্যাতি ও প্রভাব তখন রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

আধ্যাত্মিক সংকট (১০৯৫ খ্রি.)

"আমার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেল, আমি কথা বলতে পারছিলাম না..."

শক্তির তুঙ্গে থাকা অবস্থায় তিনি সত্যের সন্ধানে সংশয়বাদী হয়ে পড়েন। তিনি অনুভব করেন, শুধুমাত্র বাহ্যিক জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। এই মানসিক দ্বন্দ্বে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শিক্ষকতা ছেড়ে দেন।

দামেস্ক ও জেরুজালেমে নির্জনবাস

সময়কাল: ১০ বছর

তিনি পরিবার ও পদমর্যাদা ত্যাগ করে দামেস্কে উমাইয়া মসজিদের মিনারে নির্জনে ইবাদতে মগ্ন হন। এরপর জেরুজালেমে যান। ঝাড়ুদার বা সাধারণ মানুষের বেশে তিনি ঘুরে বেড়াতেন আত্মশুদ্ধির সন্ধানে।

ইহয়া উলুমুদ্দীন (ধর্মীয় জ্ঞানের পুনর্জাগরণ)

তাঁর ১০ বছরের নির্জনবাসের ফসল এই মহাকাব্যিক গ্রন্থ। এটি মুসলিম মানসকে শুষ্ক যুক্তিবাদ থেকে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির দিকে ফিরিয়ে এনেছিল। গ্রন্থটি চারটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত:

০১

ইবাদত (Rub' al-Ibadat)

নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা।

০২

আদাত (Rub' al-Adat)

দৈনন্দিন জীবনের শিষ্টাচার। বিবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, হালাল-হারাম এবং সামাজিক সম্পর্কের নিয়মাবলি।

০৩

মুহলিকাত (Rub' al-Muhlikat)

ধ্বংসাত্মক দোষসমূহ। অন্তরকে কলুষিত করে এমন বিষয় যেমন—ক্রোধ, হিংসা, লোভ, কৃপণতা ও অহংকারের চিকিৎসা।

০৪

মুনজিয়াত (Rub' al-Munjiyat)

পরিত্রাণকারী গুণাবলী। তওবা, সবর (ধৈর্য), শোকর (কৃতজ্ঞতা), ভীতি ও আশা, এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার আলোচনা।

প্রত্যাবর্তন ও ইন্তেকাল

দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর নিজামুল মুলকের পুত্র ফখরুল মুলকের অনুরোধে তিনি কিছু সময়ের জন্য নিশাপুরে শিক্ষাদানে ফিরে আসেন। তবে শীঘ্রই তিনি নিজ জন্মভূমি 'তুস'-এ ফিরে যান এবং সেখানে একটি খানকাহ (সুফি কেন্দ্র) ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্তিম মুহূর্ত (১১১১ খ্রি.)

"সোমবার সকালে তিনি অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। এরপর কাফনের কাপড় চেয়ে নিলেন, চোখে চুমু খেলেন এবং বললেন, 'প্রভুর আদেশ মাথা পেতে নিলাম'। এরপর কিবলামুখী হয়ে শুয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।"

“জ্ঞানের রাজ্যে এমন কোনো বিষয় নেই যেখানে গাজ্জালীর ঘোড়া দৌড়ায়নি।”

- ঐতিহাসিকদের মন্তব্য