দুই জান্নাতী যুবকের সর্দার: জীবনকথা

হযরত ইমাম হাসান (আ.) ও হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)

ভূমিকা

হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী (আ.) এবং হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আ.) ইসলামের ইতিহাসে এক আলোকোজ্জ্বল নাম। তাঁরা ছিলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের সর্দার এবং হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর প্রিয় সন্তান। তাঁদের জীবন, আত্মত্যাগ এবং নীতি-আদর্শ মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

১. হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর জীবনকথা

১.১ জন্ম ও শৈশব

ইমাম হাসান (আ.) মদিনায় হিজরী ৩ সালের রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেন। মহানবী (সা.) তাঁর কানে আজান ও ইকামত দেন এবং তাঁর নাম রাখেন 'হাসান'। হাসান অর্থ উত্তম বা সুন্দর। মহানবী (সা.)-এর কোলে এবং তত্ত্বাবধানে তাঁর শৈশবের প্রাথমিক বছরগুলি অতিবাহিত হয়। তিনি ছিলেন চেহারা ও চরিত্রে মহানবীর (সা.) সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।

১.২ রাসূলের (সা.) ভালোবাসা ও মর্যাদা

রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায়ই হাসান ও হুসাইনকে বুকে জড়িয়ে বলতেন, "এঁরা দু'জন আমার দুনিয়ার সুগন্ধি।" তিনি আরও বলেন, "হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার।" হাদীসে কিছা (চাদরের ঘটনা)-এর মাধ্যমেও প্রমাণিত যে, ইমাম হাসান (আ.) ছিলেন আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য, যা তাঁর উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।

১.৩ খিলাফত গ্রহণ ও মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধি

হিজরী ৪০ সালে পিতা হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর কুফাবাসী ইমাম হাসান (আ.)-এর হাতে খিলাফতের বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তিনি প্রায় ছয় মাস মুসলিম উম্মাহর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ এড়ানোর মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি কঠিন শর্তে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে সন্ধি স্থাপন করেন (হিজরী ৪১ সাল)। এই সন্ধির ফলে উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ইমাম হাসান (আ.) 'আস-সিদ্দিক' (মহান সত্যবাদী) এবং 'আল-মুসলিহ' (শান্তি স্থাপনকারী) উপাধিতে ভূষিত হন।

১.৪ মদিনায় জীবনযাপন ও শাহাদাত

সন্ধির পর ইমাম হাসান (আ.) মদিনায় ফিরে যান এবং বাকি জীবন সেখানে নির্জনে অতিবাহিত করেন। তিনি ধর্মীয় শিক্ষাদান, ইবাদত এবং জনগণের সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে সময় কাটান। তিনি একাধিকবার হজে পায়ে হেঁটে মক্কা শরীফ গমন করেন। হিজরী ৫০ সালের সফর মাসে তাঁকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করা হয়। তাঁকে মদিনার জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

২. হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জীবনকথা

২.১ জন্ম ও শৈশব

ইমাম হুসাইন (আ.) মদিনায় হিজরী ৪ সালের শাবান মাসে জন্মগ্রহণ করেন। মহানবী (সা.) তাঁর নাম রাখেন 'হুসাইন'। ইমাম হুসাইন (আ.)-ও তাঁর শৈশবের মূল্যবান সময় দাদাজান মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্যে কাটান। ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন রাসূলের (সা.) হৃদয়ের টুকরা এবং তিনি তাঁকে খেলাচ্ছলে বহন করতেন ও আদর করতেন।

২.২ ন্যায়ের পথে অবিচলতা

পিতা আলী (রা.) ও ভাই হাসান (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হুসাইন (আ.) প্রায় দশ বছর মদিনায় অবস্থান করেন। হিজরী ৬০ সালে মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ খলিফা হলে ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, "যে কেউ তাঁর মতো লোকের হাতে বাইয়াত করবে, সে ইসলামের ধ্বংস ডেকে আনবে।" তিনি শাসক হিসেবে ইয়াজিদের নৈতিক ও ধর্মীয় অযোগ্যতা মেনে নিতে পারেননি।

২.৩ কুফার পথে যাত্রা ও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা

যখন কুফার লোকেরা ইয়াজিদের অন্যায় শাসন থেকে মুক্তি পেতে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে তাদের নেতা হওয়ার জন্য চিঠি লেখে, তখন তিনি মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে পথেই তিনি জানতে পারেন যে, কুফার পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। কুফার নিকটবর্তী কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনী তাঁকে ও তাঁর পরিবার-পরিজনকে অবরোধ করে।

কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.) সত্য ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থেকে ইয়াজিদ বাহিনীর লক্ষাধিক সৈন্যের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি তাঁর অল্প সংখ্যক সাথী নিয়ে হিজরী ৬১ সালের ১০ই মহররম (আশুরা) তারিখে অসম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

২.৪ শাহাদাত ও চিরন্তন শিক্ষা

আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.), তাঁর ভাই, পুত্র ও সাথী-সহ প্রায় ৭২ জন সদস্য শাহাদাত বরণ করেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নামাজরত অবস্থায় শহীদ হন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এক মহৎ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। তাঁর শাহাদাত উম্মাহকে শেখায় যে, যখন ইসলাম বিপন্ন হয় এবং জালিম শাসক প্রতিষ্ঠা পায়, তখন মাথা নত না করে সর্বস্ব দিয়েও সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে হয়।

২.৫ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর উত্তরাধিকার

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগ শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতীক। তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর পরিবারকে বন্দী করা হলেও, তাঁদের দৃঢ়তা পরবর্তীকালে উমাইয়া শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং মুসলিম বিশ্বে এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়।

উপসংহার

ইমাম হাসান (আ.) তাঁর সন্ধির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচিয়েছিলেন এবং ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক নীতি ও ন্যায়বিচারকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের জীবন দুটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে ইসলামের সেবা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার সর্বোচ্চ উদাহরণ। তাঁরা চিরকাল মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে জীবন্ত থাকবেন।